মাস্কেও আছে ফ্যাশন ।

করোনার বিস্তারে মানুষের জীবনধারায় পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে নানা পথ বেছে নিচ্ছে মানুষ। এখন আর ঘরে বসে থাকার উপায় নেই। মানুষ কাজে বের হচ্ছে। বাড়ির বাইরে গেলেই মুখে মাস্ক এঁটে নিতে হবে—এটাই করোনা রোধের কঠিন শর্ত। সরকারি নির্দেশনায়ও মাস্ক না পরে বা অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বাইরে চলাচল করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানার বিধানের কথা জানানো হয়েছে। বর্তমানে মাস্ক ব্যবহারে নিরাপত্তা ও প্রয়োজনের পাশাপাশি ফ্যাশনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

ই-কমার্সভিত্তিক ব্যবসায়িক উদ্যোগ ‘মাস্ক ইউ’–এর মাস্ক বাজারে এসেছে সপ্তাহখানেক আগে। এই মাস্কের উদ্যোক্তারা জানালেন, এর মধ্যেই বেশ সাড়া ফেলেছে মাস্কগুলো। বাংলাদেশ, দ্য লিডার, স্পাইডারম্যান, ডিপ ইন ব্ল্যাক, ক্যাট ফেস, ডোরেমন, এলসা, স্পাইডার কিড, সুপার বয়, দ্য লেডি, টম অ্যান্ড জেরি, বাংলা মুভি, মোরগলড়াই, নকশিকাঁথা, রিকশা পেইন্ট, ক্যাপ্টেন আমেরিকা, দ্য মাস্কসহ বিভিন্ন শিরোনামের ৫২টি মাস্ক অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। নতুন করে আরও ৯৩টি নকশার মাস্ক বাজারে আসবে শিগগিরই। মাস্কগুলোর দাম ২৫০ টাকা।

মাস্ক ইউর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ মারুফ জানালেন, চীনের একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে সে দেশে তৈরি এ মাস্কগুলো আনা হয়েছে। এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন দেশের তরুণ কর্মী বাহিনী। কয়েক দিনের মধ্যেই চাহিদা ও ফরমাশের পরিমাণ বেড়েছে। পরিবারের ছোট–বড় সবার পছন্দের কথা চিন্তা করে একেক পরিবার থেকেই বেশ ভালোসংখ্যক মাস্কের অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ কাপড়ে প্রিন্টের মাস্কগুলোতে নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

করোনার নয়া স্বাভাবিকতা বা নিউ নরমালের যুগে মাস্কের উদ্যোগ নিয়ে এম এ মারুফ বলেন, ‘মাস্ক ইউর মুখোশ মুখে সেঁটে থাকা আবরণ মাত্র নয়। বরং বিষণ্ন সময়ে মুখোশের আড়ালে ঢেকে যাওয়া মানুষের মুখরতার গল্প। মাস্ক বাজারে আনার আগে আমরা গবেষণা করেছি, সময় নিয়েছি। এই পরিবর্তিত সময়ে রং যাতে হারিয়ে না যায়, সে বিষয়টিতে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। মাস্ক ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য বিষয়টিতে ভিন্ন মাত্রা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কার্বন ফিল্টারযুক্ত মাস্ক আনা হবে, যা শুধু একবার ব্যবহার করা যাবে, এ ছাড়া অন্য মাস্কগুলো অন্ততপক্ষে ৫০ বার ধুয়ে ব্যবহার করা যাবে।’

রাজধানীর বনানীতে গত ১৭ মে থেকে লকডাউনে কাজ হারানো নারী গৃহকর্মীরা গেঞ্জি কাপড়ের মাস্ক বানাচ্ছেন। এ সুযোগ করে দিয়েছে সংযোগ বাংলাদেশ নামের বেসরকারি একটি সংস্থা। সংযোগ বাংলাদেশ বিভিন্ন স্কুল পরিচালনা করে। মাস্ক বানানো এই কর্মীদের বাচ্চারা পড়াশোনা করে ওই স্কুলগুলোতে। সংযোগ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী সাদিয়া নাসরিন জানালেন, লকডাউনে এই নারীদের কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে মূলত উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে। ভালো সাড়া মিলেছে। আর মাস্ক বানানো হচ্ছে লাল, সাদা, কালো, নীল, কমলাসহ বিভিন্ন রঙের। কাজে বের হওয়ার সময় পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে মাস্ক পরছেন অনেকে। সাদিয়া নাসরিন জানালেন, তিনি নিজেও শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে মাস্ক ব্যবহার করছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে বানানো মাস্কগুলো ২৫ টাকার মধ্যে কিনতে পাওয়া যাচ্ছে।

গুটিপার উদ্যোক্তা তাসলিমা মিজি জানালেন, তিনি মূলত লেদারের ব্যাগ বানান। তবে লকডাউনে বসে না থেকে তাঁর কারখানার কর্মীদের দিয়ে মাস্ক বানানো শুরু করেন। বর্তমানে কাজ করছেন বাক-শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের সঙ্গে, যাঁরা ইশারা ভাষায় কথা বলবেন বা যোগাযোগ করবেন, তাঁদের ব্যবহারের জন্য একধরনের মাস্ক নিয়ে। কাপড়ের এ মাস্কের ঠোঁটের জায়গাটুকুতে ট্রান্সপারেন্ট প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে।

তাসলিমা জানালেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরনের মাস্ক বানানো ও তা নিয়ে নানা গবেষণা চলছে। সে ধরনের একটি উদ্যোগ থেকেই বাক-শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য মাস্কের বিষয়টি নজরে আসে। এ মাস্কটি আসলেই ব্যবহার উপযোগী কি না, তা যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে। এ ছাড়া এখন তো আর ঘরে বসে থাকার উপায় নেই, অফিস করতেই হচ্ছে। অফিসে ছেলেদের ব্যবহারের জন্য বানানো হয়েছে ‘এক্সিকিউটিভ মাস্ক’। আর মূলত প্রয়োজনের পাশাপাশি ফ্যাশনের দিকটাকে বিবেচনায় নিয়ে গামছা কাপড়ের সঙ্গে অন্য কাপড়ের লেয়ার দিয়ে বানানো হয়েছে গামছা মাস্ক। এটি ব্যবহারে বেশ ভালোই সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। তাসলিমা জানালেন, তাঁর বানানো মাস্ক ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।

স্নো-ট্যাক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সারা লাইফস্টাইলের পরিচালক শরিফুন নেছা জানালেন, এখন সারার বিভিন্ন আউটলেটে মাস্কের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ক্রেতার চাহিদা পূরণে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ৩ থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুদের জন্যও মাস্ক বানানো হয়েছে। এগুলো আরামদায়ক ও বাচ্চাদের পছন্দ হবে এমন রং ব্যবহার করা হয়েছে। দেশের বাইরে ফ্রান্সের এক ক্রেতা ২৬ লাখ পিস মাস্কের অর্ডার দিয়েছেন।

শরিফুন নেছা বলেন, ‘আমরা সুরক্ষার বিষয়টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। এ ছাড়া বিভিন্ন রঙের বানানো হয়েছে, কেউ চাইলে পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে পরতে পারবেন। দাম ৪০ টাকার মধ্যে বলে চাহিদাও বেশি।’ ভারতের পুনের বাসিন্দা শংকর কুরাদে সোনার তৈরি মাস্ক ব্যবহার করে রীতিমতো গণমাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছেন। কেননা, এই ব্যক্তির এক মাস্কের দামই প্রায় তিন লাখ রুপি। কোনো কোনো দেশে হীরা, জহরত বসানো মাস্কের ব্যবহারও হচ্ছে।