সোনালি মাছের শহরে ।

যদি কখনো হংকংয়ের কওলন শহরের মংককের টুং চুইয়ের রাস্তায় সন্ধ্যায় হাঁটতে বের হন, তাহলে চারপাশের উজ্জ্বল সোনালি আভায় চোখ ও মন জুড়িয়ে যাবে। টুং চুইয়ের ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে তাকালে মনে হবে যেন এক সোনার খনির মতো মনোমুগ্ধকর ও জাদুকরি স্বপ্নরাজ্যের মাঝে এসে পড়েছি। আর এই স্বপ্নরাজ্যই হচ্ছে হংকংয়ের বিখ্যাত গোল্ডফিশ স্ট্রিট, যা দিনে দিনে ছোট–বড় সবার কাছে ভীষণ পছন্দের ঘুরে বেড়ানোর জায়গা হয়ে উঠেছে। প্রায় ৩০০ মিটার রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে অজস্র দোকান, যার অধিকাংশ দোকানে গোল্ডফিশ বিক্রি হয়। এসব দোকানের অ্যাকুয়ারিয়াম এবং ফুটপাতে পলিব্যাগে ঝুলিয়ে রাখা থাকে হাজার হাজার গোল্ডফিশ।

এই রাস্তা ধরে হাঁটলে আরও দেখা যাবে গোল্ডফিশকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্থানীয়দের জীবনযাপন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। দোকানগুলো ভোরের আলো ফুটতে ফুটতেই খুলে যায় এবং দিনভর বেচাকেনা শেষে রাত ১০টায় বন্ধ হয়ে যায়। চায়নার নতুন বছর উপলক্ষে দোকানগুলো কয়েক দিন মাত্র বন্ধ থাকে, এ ছাড়া প্রতিদিনই খোলা। মনে রাখতে হবে, গোল্ডফিশের এই রাজ্য ঘুরে দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় সন্ধ্যার পর। কারণ, এই সময়ে গোল্ডফিশের সোনালি শরীরে চারপাশের আলো পড়ে এক অন্য রকম আবহ তৈরি করে।

মাস ট্রানজিট ট্রেন, বাস ও ট্যাক্সি ব্যবহার করে খুব সহজেই এখানে চলে আসা যায়। ট্রেনে সবচেয়ে সুবিধা। খরচ তুলনামূলক কম এবং থামে প্রিন্স এডওয়ার্ড মংক মাস ট্রানজিট রেলওয়ে স্টেশনে, যেখান থেকে টুং চুইয়ে স্ট্রিটে হেঁটেই চলে আসা যায়। তবে রেল বা বাসে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করলে ট্যাক্সিতেও সরাসরি চলে আসা যায়। টুং চুইয়ের রাস্তায় নেমে বিখ্যাত গোল্ডফিশের রাজ্যে ঘুরতে ঘুরতে এর সম্পর্কে কিছু জেনে নেওয়া যাক।

গোল্ডফিশকে পুরো চীন, হংকং, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারে সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক এবং জীবনের অংশ হিসেবে দেখা হয়। অধিকাংশ বাড়িতে গেলেই অ্যাকুয়ারিয়ামে গোল্ডফিশ দেখা যায়। অনেকেই গোল্ডফিশের ছবি আঁকা তৈজসপত্র ব্যবহার করেন। অনেক দেশেই গোল্ডফিশ আকৃতির ও রঙের মজাদার বিস্কুট বানানো হয়, যা শিশুরা ভীষণ পছন্দ করে। এই বিস্কুট তৈরিতে পনির, মাখন, গম ও ভুট্টার ময়দা, মধু ব্যবহার করা হয়। চীন, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় গোল্ডফিশ ভাজা ও রান্না করে খাওয়া হয়।

গোল্ডফিশ বেশ সুপরিচিত একটি রঙিন মাছ। রূপের দিক থেকে এর জুড়ি মেলা ভার। বিশ্বের অন্যতম নামীদামি প্রজাতির মাছ এটি৷ এই মাছ সচরাচর ছোট আকৃতির হয়ে থাকে৷ গোল্ডফিশ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের মাছ হলেও বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এটি পাওয়া যায়। পৃথিবীতে প্রায় ১২৫ প্রজাতির গোল্ডফিশ আছে। মাছটি ২৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে এবং ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড় হয়। যুক্তরাজ্যের নর্থ ইয়র্কশায়ারে ১৯৯৯ সালে একটি গোল্ডফিশ ৪৩ বছর বয়সে মারা গিয়েছিল। এটি গোল্ডফিশের বেঁচে থাকার রেকর্ড।

সাধারণত সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ও শখের বশে অনেকেই বাসার অ্যাকুয়ারিয়ামে গোল্ডফিশ পালন করে থাকেন। তাই বাসার অ্যাকুয়ারিয়ামে পালন করা অধিকাংশ মাছই দেখা যায় গোল্ডফিশ প্রজাতির। যেমন কমেট, ওয়াকিন, জাইকিন, সাবানকিন, ওরান্ডা, ব্ল্যাক মোর, ফান্টাইল, রুইকিন, ভেইল টেইল, রানচু ইত্যাদি। দেহের আকৃতি অনুসারে গোল্ডফিশ সাধারণত ডিম্বাকৃতি ও লম্বা দৈহিক গঠনের হয়ে থাকে। রোগ প্রতিরোধক্ষমতার দিক থেকে লম্বা দৈহিক কাঠামোর গোল্ডফিশগুলো বেশ শক্তিশালী হয়ে থাকে।

সুইডেনে প্রচলিত আছে যে গোল্ডফিশের স্মৃতিশক্তি মাত্র তিন সেকেন্ডের। তাই কেউ কোনো কিছু মনে না রাখতে পারলে কখনো কখনো তাকে মজা করে ‘গোল্ডফিশ মেমোরি’ বলে ডাকা হয়। কিন্তু আসলে গোল্ডফিশের স্মৃতিশক্তি এত কম নয়। গোল্ডফিশ কোনো ঘটনা কমপক্ষে তিন মাস পর্যন্ত মনে রাখতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ গোল্ডফিশের স্মরণকাল ১২ দিন পর্যন্ত হতে পারে, যা অন্তত ‘তিন সেকেন্ড’ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।

২. সন্ধ্যার আলোতে মংককের টুং চুইয়ে এবং এর আশপাশের রাস্তা ও ফুটপাতে হাঁটার অভিজ্ঞতা ছিল বৈচিত্র্যে ভরা। ঝলমলে আলোর মাঝে কত ব্যস্ত মানুষের মুখ, টুকরো টুকরো জীবনের নানা উপলক্ষ মন ভরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। রাস্তার দেয়ালজুড়ে নানা ধরনের চিত্রকর্ম, বড় বড় মান্দারিন হরফে লেখা সাইনবোর্ড ও বিলবোর্ড, লন্ঠনের মতো নকশা করা লাইটের সৌন্দর্য যেন এই রাস্তার ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।

টুং চুইয়ের গোল্ডফিশ মার্কেট ছাড়িয়ে সামনের মোড়ে গেলেই চোখে পড়বে সে ইয়েং চই স্ট্রিট, ফা ইয়ান স্ট্রিট, সই স্ট্রিট ও ডুনডাম স্ট্রিট৷ তবে মনে রাখা ভালো, কওলন শহরের মংককের এই সব রাস্তাঘাট ও দোকানপাট আগে থেকেই লোকসমাগমের জন্য বিখ্যাত। এমন ঘন লোকসমাগমের রাস্তার জন্য গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে মংককের নামও এসেছিল। ফলে এসব রাস্তা দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ থাকে। তাকালেই মনে হবে জীবনের প্রয়োজনে মানুষ শুধু ছুটছে আর ছুটছে।

রাস্তা ও ফুটপাত ঘেঁষে গড়ে ওঠা অসংখ্য দোকানে জীবনযাপনের জন্য কী নেই! সুই–সুতা থেকে শুরু করে জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সবই মেলে এখানে। তুলনামূলক কম দামে পণ্য কিনতে মংককের এসব দোকানে তাই স্থানীয় লোকজন ও পর্যটকদের ভিড় সব সময় লেগেই থাকে। ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল জিবে জল নিয়ে আসা হরেক রকমের স্ট্রিট ফুডের দিকে। হংকংয়ের ঐতিহ্যবাহী টফু, মাছের বল, পাখির বাসার অতি মূল্যবান স্যুপ, হাঁস-মুরগি, কাঁকড়া, স্কুইড-অক্টোপাসের ফ্রাই এবং স্যুপ-নুডলসসহ নানা রকমের পরিচিত-অপরিচিত খাদ্য যেন সবাইকে হাতছানি দিচ্ছে। এক ফাঁকে গোল গোল ডিমের মতো সোনালি রঙের মাছের বলের স্টিক দেখে কয়েক পিস অর্ডার করে বসলাম। খেয়েদেয়ে জানলাম, এটাই বিখ্যাত গোল্ডফিশ ও স্যামনের মিশ্রণে তৈরি মাছের বল। আরও চেখে দেখার সুযোগ হয়েছিল হংকংয়ের বিখ্যাত পনির চা। সবুজ চায়ের ওপর পনিরগুলো সাঁতার কাটতে থাকে। চিনি বা মধু, দুধ ও চকলেট পাউডার মিশিয়ে নিয়ে বারবার ঝাঁকিয়ে পান করতে হয়। তবে হংকংয়ের স্থানীয়রা শুধু গাঢ় লিকারের সঙ্গে পনির মিশিয়ে পান করে এই চা।

খাওয়াদাওয়া শেষে দেখলাম, রাতের গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে হংকংয়ের টুং চুইয়ে স্ট্রিট যেন চোখে লেগে থাকার মতো সোনালি আলোয় ভরে উঠেছে। সোনালি এই আভা যখন চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে, দূরের দোকানগুলোতে তখন ছোটাছুটিতে ব্যস্ত অজস্র গোল্ডফিশ। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আশপাশের মায়াবী সোনালি আলোয় চোখ জুড়িয়ে আনন্দ নিয়ে গোল্ডফিশ কিনে ফেলার অভিজ্ঞতা আসলেই অন্য রকম। লেখকঃ ফার্মাসিস্ট